নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন আশীর্বাদ, তেমনি এর অন্যতম বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে গুজব। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যা জন্ম দিচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা, আতঙ্ক এবং অপ্রচলিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ক্লিক বা ট্যাপেই যেকোনো কনটেন্ট শেয়ার করার সুযোগ থাকায়, এর সত্যতা যাচাই করার প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম। আবেগপ্রবণ, চাঞ্চল্যকর বা ভীতিকর বিষয়গুলো দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই অনেকে তা শেয়ার করতে শুরু করেন। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের পছন্দের বিষয়বস্তু বারবার দেখাতে থাকায় এক ধরনের ‘ইকো চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি কক্ষ তৈরি হয়। এর ফলে মিথ্যা তথ্যটিও বারবার সামনে আসতে আসতে একসময় সত্য বলে মনে হতে থাকে।
গুজবের ধরণ ও তার পরিণতি
জনস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে ধর্মীয় অনুভূতি, আর্থিক জালিয়াতি এবং ব্যক্তিগত চরিত্র হনন—সবই গুজবের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা নিয়ে নানা অবৈজ্ঞানিক তথ্যের বিস্তার জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। প্রায়শই পুরোনো বা সম্পাদনা (এডিট) করা ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। এছাড়া, ভুয়া আর্থিক প্রকল্পের গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম বলেন, “মানুষ সাধারণত সেই তথ্যগুলোই বিশ্বাস করতে চায় যা তাদের পূর্ব ধারণাকে সমর্থন করে। একে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বলা হয়। গুজব রটনাকারীরা মানুষের এই মানসিক দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। এর থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো প্রশ্ন করার অভ্যাস এবং সমালোচনামূলক মানসিকতা (ক্রিটিক্যাল থিংকিং) তৈরি করা।”
প্রতিরোধের উপায় কী?
গুজব প্রতিরোধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যেমন ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করার দায়বদ্ধতা রয়েছে, তেমনই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্য সাক্ষরতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সাধারণ ব্যবহারকারীর কাঁধেই বর্তায়। যেকোনো কিছু শেয়ার করার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা অত্যন্ত জরুরি:
- এই তথ্যের মূল উৎস কী? এটি কি নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যম বা সরকারি সংস্থা?
- খবরটি কি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা অবিশ্বাস্য শোনাচ্ছে?
- অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমে কি এই খবরটি প্রকাশিত হয়েছে?
দিনশেষে, একটি সচেতন এবং দায়িত্বশীল সমাজই গুজবের এই দাবানল মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কোনো কিছু বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে যাচাই করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

